আজ থেকে বেশ কয়েক বছর আগের কথা,আমরা কয়েকজন বন্ধু মিলে চিন্তা করলাম সমুদ্র দেখতে যাব।যেহেতু বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার,তাই এই সমুদ্র দর্শন ই আমাদের মূল লক্ষ ছিল।কিন্তু আমারা তখনও ছাত্র এবং উত্তরবঙ্গে আমাদের বাড়ি,আর কক্সবাজার দক্ষিণবঙ্গে।সমুদ্র উপভোগের জন্য আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ অর্থ ছিল না।
আমরা পঞ্চপাণ্ডব, মানে আমরা পাঁচ বন্ধু। আমাদের আর সবার মতোই বাবা-মা'র দেওয়া সুন্দর নাম আছে,তবে আমারা একে অপরকে সেই নামে ডাকি না,কারন আমাদের নিজেদের দেওয়া নিজেস্ব আলাদা নাম আছে।এই যে আমি আমাদের সেই পূরণো স্মৃতি গুলা স্বরণ করছি,আমার নাম বল্টু।আমার নাম কেন বল্টু তা আমি জানি না,এই নাম দিয়েছে আমাদের পঞ্চপাণ্ডবের জেষ্ঠ সদস্য কানাবাবা। অবশ্য কানাবাবা নাম টা আমারই দেওয়া,কারন ওর চশমা ছাড়া চলে না।ধরে নিতে পারেন কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ এর উপন্যাস দারুচিনি দ্বীপ অবলম্বনে নির্মিত সেই চলচ্চিত্রের চরিত্র কানাবাবা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ওর নাম রাখা। আমাদের আরো অন্য এক সদস্যের নাম আমি রেখেছি হিটলার,যে কোনো কাজে ওর তাড়াহুড়ো,তাই এই নামটি দেওয়া। কানাবাবা অবশ্য বাকি দুই জনেরও নাম ঠিক করে দিয়েছে।গ্রুপের চতুর্থ সদস্যের নাম বোতল পঞ্চম তথা সর্ব কনিষ্ঠ জনের নাম কোদু। আমাদের প্রত্যেকেরই বয়সের ভিন্নতা আছে কিন্তু মনের দিক দিয়ে আমরা সবাই এক।এই যাত্রায় আমাদের আসল নাম গুলা না হয় গোপন ই থাকুক।
যাই হোক আমাদের সেই প্ল্যান অনুযায়ী আমরা ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে প্রথম কক্সবাজারে সমুদ্র দর্শন করি। এর মধ্যে প্রথমে বোতলের তারপর হিটলারের এবং ট্যুরের মাত্র কিছুদিন আগেই কানাবাবা চাকুরী পেয়ে যায়। এবং ভাগ্যক্রমে তিন জন ই গাজীপুর একটা সনামধন্য কোম্পানিতে চাকুরী পায়।যার সুবাদে ওরা গাজীপুরে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে থাকত। আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী আমরা সবাই গাজীপুর পৌঁছালাম।আমি তখন নওগাঁ জেলায় থাকতাম,সেখান থেকে গাজীপুর ,আর কোদু নীলফামারী থেকে গাজীপুর। অনেক দিন পর পাঁচ বন্ধু একসাথে হলাম সমুদ্র দর্শন করবো বলে।
আমরা গাজীপুর থেকে ঢাকা বিমানবন্দর রেল স্টেশন পৌছালাম,বিভিন্ন ধরনের খাবার কিনলাম ট্রেনের ভিতরে গল্প আড্ডার মাঝে খুদা মিটানোর জন্য।তারপর ট্রেনে করে চট্টগ্রামে কোদুর আপুর বাসায় পৌছালাম।আপুর আপ্যায়ন দেখে আমরা মুগ্ধ।বিশেষ করে আপুর রান্না গলদা চিংড়ির স্বাদ এখনো মুখে গেথে আছে।যদিও আপুর বাসায় যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের ছিল না, কিন্তু ট্রেনে কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছে ছিল,আর ট্রেন চট্টগ্রাম অব্দি যায়। আর কোদু আমাদের গুগল ম্যাপ হিসাবে কাজ করে,এবং আপুরা তখন চাকুরী সুত্রে চট্টগ্রামে থাকতেন এবং আপুর সাথেও অনেক দিন দেখা হয় নি তাই আমাদের প্ল্যানে এটা কোদু যোগ করেছিল।তারপর চট্টগ্রাম থেকে রাতে বাসে রউনা হলাম কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে। যথারীতি আমরা ভোরে পৌছালাম যখন,তখন ঠিক ফজরের আজান শুনতে পাচ্ছিলাম।
প্রথম কক্সবাজার আসলাম আর আমাদের পিছনে অনেক গুলো হোটেলের দালাল গোছের লোক ব্যাগ নিয়ে টানাটানি শুরু করলো তাদের হোটেলে যাবার জন্য।আমরা কিছু বুঝতে পারছিলাম না কি করবো।আমাদের প্ল্যানে হোটেল পরে নিব,আগে ঘোরাঘুরি করবো তারপর দেখে শুনে হোটেলে উঠবো।যাইহোক দালালদের থেকে রেহাই পেয়ে আগে আমরা মসজিদে গেলাম তারপর ফজর নামাজ শেষে সেখানে মুসুল্লিদের থেকে দিক নির্দেশনা নিলাম। কিন্তু মসজিদ থেকে বাহির হতেই আবার অটো বাইক ওয়ালার হাতে পরলাম,আবার সেই একই জালা,সেও হোটেলের দালাল চক্রের লোক। অনেক কথার পর তার সাথে হোটেলের ব্যাপারটা দফারফা করালাম এবং আমাদের লাবনী বিচে পৌছে দিতে বল্লাম।
এই প্রথম আমারা নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরা পৃথিবীর দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকতের লাবনী বিচে পৌছালাম। আহ সে কি অনুভূতি , কি আনন্দ যে উপভোগ করেছে সেই বুঝবে,যা ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। সাগরের নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জন সাথে হিমেল হাওয়ায় মনোমুগ্ধকর এক পরিবেশ। দিগন্তজোড়া বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা,সৈকতের বুকে আছয়ে পড়া ছোট বড় একেকটা ডেউ।দানব আকারের টিউব নিয়ে সেই ডেউ এর মাঝে সাতারকাটা,ওয়াটার বাইক নিয়ে ডেউয়ের মাঝে রেস করা যেন বাঁধ ভাঙ্গা আনন্দ।কিছু দুরে নৌকা ও ট্রলার নিয়ে জেলেদের কর্মচাঞ্চল্যতা,ভোরের আকাশে পূর্ব পাহাড়ের পেছন থেকে বেরিয়ে আসা সূর্য। এ যেন সৃষ্টিকর্তা আমাদের রূপসী বাংলার সব রূপ ঢেলে দিয়েছে এই বালুর আঁচলে।
১২০ কিলোমিটারের দীর্ঘ দর্শনীয় সমুদ্র সৈকত।কারো কারো মতে এর আদি নাম ছিল পালংকি। আবার অনেকের মতে এর নাম ছিল প্যানোয়া,যার অর্থ হলুদ ফুলের রাজ্য। ব্রিটিশ শাসনামলে এ অঞ্চলের শাসন ও উন্নয়নের জন্য ইংরেজ সরকার লেফটেন্যান্ট হিরাম কক্স-কে প্রেরণ করেন। তিনি ছিলেন মানব হিতৈষী। মি. কক্স এই অঞ্চলে বাজার গড়ে তোলেন। কক্স সাহেবের নামে এ বাজারের নামকরণ করা হয় কক্সবাজার। পরবর্তীতে এই বাজারের নাম থেকে এ জেলার নাম হয়েছে কক্সবাজার। নাজিরার টেক থেকে শুরু করে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তৃত এ সৈকতের বেলাভূমি।
যাই হোক আমরা লাবনী পয়েন্ট থেকে হেটে কলাতলি বিচে গেলাম, প্রথমে তেমন কোলাহল ছিল না,কিন্তু কিছু সময় পার হতেই মানুষের সমাগম বারতে থাকলো।আমরা আনন্দে উল্লাসে মাততে থাকলাম। একটু পরেই টের পেলাম খুব খুদা লাগতেছে।তাই কাল বিলম্ব না করে চলে গেলাম খাবার হোটেলে।এখানে একটা কথা উল্লেখ না করলেই নয়, কক্সবাজারে সব খাবার ই প্যাকেজ হিসাবে পাওয়া যায়।এটা প্রায় ট্যুর অঞ্চল গুলাতেই এখন লক্ষণীয়।তবুও কক্সবাজারে এটা একটু স্পেশাল মনে হয়েছে। দুর দুরান্ত, দেশ বিদেশ থেকে বহু পর্যটক আসে এবং এখানে বিখ্যাত সব সামুদ্রিক খাবার উপভোগ করে তাই হোটেল গুলাতে বিভিন্ন রকমের খাবারের প্যাকেজ সাজিয়ে রাখে। যথারীতি আমরা সকালের নাস্তা সেরে নিলাম। তারপর সুগন্ধা পয়েন্টের বার্মিজ বাজারে কেনাকাটা করতে থাকলাম।নানা ধরনের জিনিস পত্র নিয়ে অনেক গুলা দোকান পসরা সাজিয়ে আছে।এটা এক অন্যরকম সৌন্দর্য।
আমরা বার্মিজ বাজারে কেনাকাটা শেষ করে হোটেলের উদ্দেশ্যে রউনা হলাম।পথিমধ্যে এক দালাল (দালাল এ জন্য বল্লাম,কারন সে কমিশন নিচ্ছিল) সুন্দর এক হোটেলে নিয়ে গোল,এবং আমরা হোটেলে চেক ইন করলাম।তারপর বাহির হলাম হিমছড়ি পর্যটন কেন্দ্র এবং ইনানী বিচের উপলক্ষে।
কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত থেকে মাত্র ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত হিমছড়ি পর্যটন কেন্দ্র। আর পাহাড়ের কোল ঘেঁষে এ সমুদ্র সৈকতের নাম হিমছড়ি।এখানকার সমুদ্র সৈকতটি অপেক্ষাকৃত নির্জন ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। এর সৌন্দর্যও কোনো অংশে কম নয়। সারি সারি সবুজ ঝাউবীথি, পাহাড়, ঝর্ণা, আর নরম বালির মাঝে দীর্ঘ অপরূপ সৈকত।সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো হিমছড়ি যত না সুন্দর তার চাইতে সুন্দর ও রোমাঞ্চকর হল কক্সবাজার থেকে এ সৈকতে যাওয়ার পথটি। একপাশে বিস্তৃর্ণ সমুদ্রের বালুকা বেলা আর এক পাশে সবুজ পাহাড়ের সাড়ি। মাঝে পিচ ঢালা মেরিন ড্র্রাইভ।এই মেরিন ড্র্রাইভ দিয়ে ভ্রমণকারীরা কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত সাগরের পাড় প্রাণবন্ত হয়ে উপভোগ করে।
সেই সময় ৩০ টাকা মূলের টিকিট নিয়ে প্রবেশ করতে হত হিমছড়ি পর্যটন কেন্দ্রতে। আমরা যথারীতি টিকিট নিয়ে সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলাম।৩০০ ফুট উচ্চতার এই পাহাড় টিতে কত সংখ্যক সিড়ি আছে তা আমার হিসাবে নেই।আনন্দের ছলে আমরা পাহাড়ের চুড়ায় পৌছে গিয়েছিলাম। সেখানে জুয়েল নামে এক ছোট ভাইয়ের সাথে পরিচয় হলো।জানতে পারলাম যারা এই পর্যটন কেন্দ্রটি সরকার হতে লিজ নিয়েছে তাদের একজন পার্টনারের ছেলে তিনি।সেই সুবাদে সে আমাদের পাহাড়ের অনেক অসাধারণ কিছু স্থান পরিদর্শন করার সুযোগ করে দিয়েছিল এবং আমাদের সব গ্রুপ ফটো উঠানোর গুরু দায়িত্বও সে নিয়েছিল।
হিমছড়ি পর্যটন কেন্দ্রে অনেক সুন্দর মুহূর্ত উপভোগের পর আমরা কক্সবাজার শহর থেকে প্রায় ২৮ কি.মি দক্ষিণে অবস্থিত ইনানি সৈকতের দিকে রউনা হলাম।ইনানী সৈকত ১৮-কিলোমিটার দীর্ঘ যা কক্সবাজার জেলার উখিয়া উপজেলায় অবস্থিত।এখানে রয়েছে সবুজ ও কালো বর্ণের অনেক প্রবাল পাথর যা দেখে আমরা বিস্মিত হয়েছিলাম।
আমার সেখানে যাওয়ার পর এটিএন নিউজের এক সাংবাদিক আপুর সাথে দেখা হয়।আমরা পঞ্চপাণ্ডব একই রং এর পোশাক পরায় তার দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছিল।যার দরুন সে আমাদের ভ্রমণ সম্পর্কে তৎক্ষনাৎ সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন এবং সেটা প্রচার ও করেছিলেন।যা ট্যুর থেকে ফিরে এসে অন্য বন্ধু বান্ধব ,আত্মীয়দের থেকে জানতে পেরেছিলাম।
বল্টু
লিভারপুল,ইংল্যান্ড
০৪ জানুয়ারী ২০২৫





আলহামদুলিল্লাহ! দেশে থাকাকালীন দুইবার কক্সবাজার সমুদ্র ভ্রমণের সুযোগ হয়েছিল। অসাধারণ একটা জায়গা।
উত্তরমুছুনচমৎকার একটা ভ্রমণ কাহিনী। তবে বন্ধুদের সাবার নাম গুলা সত্যিই হাস্যকর 😅