বল্টুদের কক্সবাজার ভ্রমণ (দ্বিতীয় পর্ব- সেন্টমার্টিন)

ঠিক কবে প্রথম এই দ্বীপটিকে মানুষ শনাক্ত করেছিল তা জানা যায় নি। প্রথম কিছু আরব বণিক এই দ্বীপটির নামকরণ করেছিল জিঞ্জিরা।ইতিহাস ঘেটে জানতে পারি, অনেক বছর আগে এই দ্বীপটি সাগরে তলে ডুবে যায়, ডুবে যাওয়ার প্রায় ৪০০ বছর পর এই দ্বীপের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। প্রায় ২৫০ বছর আগে এই দ্বীপটি আরবের কিছু নাবিক বিশ্রামের জন্য ব্যবহার করত, এইখান থেকে এই দ্বীপের উৎপত্তি। প্রায় ১০০ থেকে ১২৫ বছর আগে থেকে এখানে লোকের বসতি শুরু হয়েছিল।বলছিলাম বাংলার দক্ষিণ স্বর্গ খ্যাত সেন্টমার্টিন এর কথা,যা বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ।

ছবি : সেন্টমার্টিন জেটি ঘাট হতে।

আমরা কক্সবাজার ভ্রমণ শেষে পর দিন সকালে সেন্টমার্টিন দ্বীপের উদ্যেশ্যে রউনা হই।যেহেতু আগে আমরা সেখানে কখনো যাই নি তাই,জুয়েল ভাই এর মাধ্যমে একটা ট্যুর প্যাকেজ নিয়েছিলাম।জুয়েল ভাই; সেই হিমছড়ি পাহাড়ে যার সাথে আমাদের পরিচয়।এর মাঝে কক্সবাজারে সে আরো অনেক কিছু ঘুড়িয়ে দেখিয়েছিল,যার দরুন তার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ। যাই হোক পরদিন ভরে ৬ টার দিকে আমাদের হোটেলের সামনে বাস উপস্থিত। আমরা তারাহুরো করে হোটেল চেক আউট করে বাসে উঠলাম। ইচ্ছে ছিল আমরা একই সাথে পাশাপাশি বসব,কিন্তু আমরা পঞ্চপাণ্ডব শেষ যাত্রী গ্রুপ হওয়ায় সেটা আর হয়ে উঠে নি।কক্সবাজার জেলা হতে ১২০ কিলোমিটার দূরে এই দ্বীপটি অবস্থিত।আমরা বাসে ভ্রমণ উপভোগ করতে লাগলাম।মাঝপথে আমাদের সকালের নাস্তা সরুপ ডিম,কলা আর পাউরুটি দেওয়া হলো।যেটা আমাদের ট্যুর প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। আমাদের ট্যুর প্যাকেজটি মূলত "কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন-কক্সবাজার" ১ রাত থাকা খাওয়া সযাতায়াতের এর সমস্ত খরচ তারা বহন করবে এমন একটা প্যাকেজ।প্যাকেজের মূল্য ছিল ১৭০০ টাকা জন প্রতি। যাইহোক যথাসময়ে বাস থেকে আমরা যেটি ঘাটে পৌছালাম। সেখান থেকে আমাদের কুতুবদিয়া নামে একটি সীপের টিকিট দেওয়া হলো। আমরা আনন্দ উল্লাস করতে করতে সকাল ৯ টায় জাহাজে উঠলাম। জাহাজে উঠে যা আনন্দ লাগছিলো তা ভাষায় প্রকাশ করার মতো না। আমাদের টিকিট ছিল সাধারণ ডেকের টিকিট।আমরা ভেবেছিলাম আমাদের চুপচাপ বসে ঘুমিয়ে সময় পার করতে হবে,কোনো আনন্দ করতে পারবো না,কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই দেখলাম কেউ সিটে বসে নেই,সবাই যার যার মতো নাফ নদীর প্রকৃতি উপভোগ করছে। আমাদের আর পায় কে! আমরা বাঁধ ভাঙ্গা উল্লাস নিয়ে আনন্দ করতে লাগলাম। আমরা জাহাজের সম্মুখ অংশে দাঁড়িয়ে বিশাল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে থাকলাম। যতই অগ্রসর হচ্ছি ততই ঢেউ বাড়ছিল। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ের পানি ছিটকে আমাদের গা ভিজাচ্ছিল। সামনে দুচোখজুড়ে নীল জলরাশি আর মিয়ানমার সীমান্ত। দীর্ঘক্ষণ পর জাহাজের পেছন দিকে গেলাম। ইঞ্জিনের পাখার ঘূর্ণিতে সাদা পানির ঢেউয়ের সঙ্গে মাছের খেলা। মনে হয় হাত বাড়লেই ধরা যাবে মাছ। ওপরে পাখি উড়ছে। মাছ ধরার জন্য ব্যস্ত পানকৌড়ি। বিশেষ করে জাহাজে পিছ পিছ যে পাখি গুলা উড়ে আসছিল সেটা অন্য রকম মুহূর্ত। আমরা ক্যান্টিন থেকে চিপস নিয়ে পাখি গুলাকে খাওয়াচ্ছিলাম।ছবি উঠাচ্ছিলাম এমনকি পাশে আরো একটি জাহাজ নাম কেয়ারী সিন্দাবাদ ছিল যেটি আমাদের সাথে পাল্লা দিয়ে যাচ্ছিল।আমরা এই সব উপভোগ করছিলাম।এক কথায় এই জিনিসটা কাছে থেকে উপভোগ না করলে বুঝানো সম্ভব না।

ছবি : কুতুবদিয়া সীপ থেকে।

প্রায় আড়াই ঘন্টা সীপ জার্নির পর আমরা আমাদের গন্তব্যে পৌঁছলাম।সেন্টমার্টিন যেটি ঘাটে নেমে মনে হলো লাখো মানুষের ঢল। এ ঢল মানুষের আনন্দের ঢল।চারপাশে খোলা-মেলা বালুকাময় সমুদ্র সৈকত,বাহারি ধরনের নৌকা,সমুদ্রের বিরামহীন গর্জন যেন নীল রঙের রাজ্যে পরিণত করেছে বাংলার এই দক্ষিণ স্বর্গ কে। প্রকৃতি দুই হাত মেলে যেন সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এই রাজ্য ।জানতে পেরেছিলাম এই দ্বীপে প্রায় ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির গুপ্তজীবী উদ্ভিদ, ২৪০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৪ প্রজাতির উভচর ও ১২০ প্রজাতির পাখি পাওয়া যায়। এছাড়াও রয়েছে ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।

ছবি : সেন্টমার্টিন জেট ঘাট।

যেদিকে চোখ যায় শুধু নীল আর নীল। আকাশ আর সমুদ্রের নীল সেখানে মিলেমিশে একাকার। এখানে অগভীর দীর্ঘ সমুদ্রতট, সামুদ্রিক প্রবাল, সাগরের ঢেউয়ের ছন্দ আমদেরকে মুগ্ধ করেছিল। নান্দনিক নারিকেল গাছের সারি যার জন্য একে নারিকেল জিঞ্জিরা ও বলা হয়। সাগরতীরে বাঁধা মাছ ধরার নৌকা-ট্রলার, সৈকতজুড়ে কাঁকড়া, ঝিনুক, গাঙচিল এসবই সেন্টমার্টিন দ্বীপের নাগরিক। যা ছোট্ট এ দ্বীপকে করেছে অনিন্দ্যসুন্দর।বেশ কিছুক্ষণ পর  আমাদের ঘোর কাটলো হোটেল বয়দের ডাকে। তারা হোটেলের জন্য পর্যটকদের ডাকছিল।যেহেতু আমরা প্যাকেজ এর আওয়তা আসছি তাই আমাদেরকে দেওয়া হোটেলের নাম্বারে কথোপকথন করলাম যে আমরা পৌছেগেছি।মুহুর্তের মধ্যেই আমাদের কে স্বাগতম জানানো হলো।জানতে পারলাম আমাদের জন্য সে আগেই জেটি ঘাটে অপেক্ষা করছিল।পরিচিত না হওয়ার অনেক লোকের মধ্যে চিনতে পারে নি ।যাইহোক হোটেল বয় আমাদেরকে হোটেলে নিয়ে গেল।হোটেল এর নাম ছিল ব্লু প্যারাডাইস।হোটেলে গিয়ে আমাদের রুম একদম ই পছন্দ হয় নি,কিন্তু কিছু উপায় ছিল না যেহেতু এটা ট্যুর প্যাকেজের অন্তর্ভুক্ত। তবে খাবার রেস্তোরাঁটা অসাধারণ ছিল,আল বাহার রেস্তোরাঁ ।চারপাশে বাঁশের ঘেড়া দেওয়া এবং মাঝে কাঠের পাটাতনের উপর আল বাহার রেস্তোরাঁ।যেমন দেখতে আকর্ষণীয় তেমনি সামদ্রিক মাছের ঘ্রাণ ছড়াচ্ছিল। যাইহোক আমাদের প্রচুর খুদা লেগেছিল।আমরা রুমে ফ্রেশ হয়ে  প্রথমে খাবার চিন্তা করলাম।সেখানে সব কিছুই টাটকা পাওয়া যায়।হরেক রকমের সামদ্রিক মাছ এবং কয়েক ধরনের মুরগী ছিল। তাই হোটেল মালিক বল্লেন আমরা কোন কোন মাছ পছন্দ করি তা যেন বাছাই করি,তারা সেগুলা আমাদের সামনেই তৈরী করে দিবে। আমরা প্যাকেজের আওতায় কি আছে সেগুলোর মধ্যে পছন্দ করলাম সাথে আরো কিছু সামুদ্রিক মাছ পছন্দ করে দিলাম।যেহেতু একটু সময় লাগবে আর পাশেই বীচ ছিল এবং সমুদ্রের গর্জন ভেসে আসছিল তাই আমরা ছুটে সমুদ্র সৈকতে গেলাম।সাগরের ফ্রেশ বাতাস আমাদের সকল ক্লান্তি আর খুদা দূর করে দিল। মূহুর্তেই আমরা ভুলে গেলাম যে আমরা খাবার তৈরী করতে দিয়ে আসছি। আমাদের বেশ কিছু ফটোগ্রাফি করলাম এবং উপভোগ করতে লাগলাম।আমাদের ফিরতে দেরি হওয়ায় হোটেল বয় আমাদের ডাকতে এসেছিল।আমাদের হুস ফিরলো তার ডাকে এবং ফিরে গেলাম আল বাহার রেস্তোরাঁয়। অসাধারণ পরিবেশন ছিল তাদের।খাবার শেষে আমরা রুমে ফিরলাম এবং প্ল্যান করলাম একটু বাজার ঘুরে দেখবো,এর মূল কারন হলো আমাদের একই রং এর থ্রী কোয়ার্টার প্যান্ট কেনা,যেটি পরে আমরা সাগরে গোসল এর সাথে ছোটাছুটি করবো।বাজারের দিকে যেতেই আমরা প্রথমে একটা দোকানে প্রবেশ করলাম এবং আমাদের পছন্দ মত প্যান্ট ও পেয়ে গেলাম তাই আর বাজারে না গিয়ে হোটেলে ফিরে আসলাম। আমরা পোশাক পরিবর্তন করে আবার সাগরের উদ্দেশ্যে বাহির হলাম।আমাদের এই পর্ব শেষ করে চলে এলাম জেটি ঘাটে এবং স্পিডবোট ভাড়া করে চলে গেলাম ছেঁড়া দ্বীপে। মূল দ্বীপের সঙ্গে ছেঁড়া দ্বীপের সংযোগস্থল স্থানীয়ভাবে গলাচিপা নামে পরিচিত।তবে সামান্য  নিচু হওয়ায় জোয়ারের সময় এটি তলিয়ে যায়। তাই ভাটার সময় হেঁটে বা সাইকেলে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া গেলেও জোয়ারের সময় নৌকা বা স্পীডবোট নিয়ে  যেতে হয়। সবচেয়ে ভালো হয় উত্তর প্রান্ত থেকে পশ্চিম বীচ ধরে সম্পূর্ণ পথ পায়ে হেঁটে গেলে। নির্জন এই পথটা অসম্ভব সুন্দর সেটে বুঝতে পেরেছিলাম পরদিন সকালে যখম সাইকেল নিয়ে বাহির হয়েছিলাম।যাইহোক আমরা স্পীডবোটে রউনা হলাম। বোট ছারতেই হিটলারের সাহেবী টুপি উড়েগেল সাগরে। এই টুপি বা হ্যাট কিনেছিলাম আমরা হিমছড়ি পাহাড় পরিদর্শনের সময়।সবাই একই রকম হ্যাট ,টি শার্ট, জুতা, প্যান্ট এক কথায় একই পোশাক আমাদের ট্যুরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল। তাই পরবর্তীতে পুরো সেন্টমার্টিন জুরে ওর জন্য একই রকম হ্যাট খুঁজেছিলাম কিন্তু তা আর মেলে নি। যাইহোক আমরা ছেঁড়া দ্বীপে পৌছালাম। ছেঁড়া দ্বীপ হলো বাংলাদেশের মানচিত্রে দক্ষিণের সর্বশেষ বিন্দু। দক্ষিণ দিকে এর পরে বাংলাদেশের আর কোনো ভূখণ্ড নেই। ট্রলার ঘাট থেকেই অসাধারণ সুন্দর দৃশ্যে আমাদের মন ভরে গেল। আমরা ট্রলার ঘাট থেকে প্রধান অংশে যেতেই পথিমধ্যে এক বয়স্ক লোককে মসজিদ নির্মাণের জন্য টাকা কালেকশন করতে দেখলাম। সে আমাদের উদ্দেশ্য করে বল্লেন যেন কিছু দান করি।আমরা যথারীতি দান করলাম। কিন্তু আমাদের বিশেষ করে এই ধরনের দান করা পছন্দ নয়। মসজিদ এর জন্য জনে জনে দান চাওয়াটা ইসলাম ধর্ম কে ছোট করা মনে করি।সে আমাদের কাছে বলেছিল সেখানে মসজিদ তৈরী করবে কিন্তু পরবর্তীতে আমি নিজে আরো চারবার সেন্টমার্টিন ও ছেঁড়া দ্বীপ বেড়াতে গিয়েছিলাম কিন্তু ছেঁড়া দ্বীপে মসজিদ আর চোখে পরে নি। আল্লাহ তাকে মাফ করুক,জানি না সে হয়তো অন্য কোনো মসজিদের কাজে লাগাতে পারে।তবে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ইসলাম ধর্মের দোহায় দিয়ে এই ধরনের ভিক্ষা বৃত্তি চালায় যার দরুন আমাদের ধর্ম অন্য সকল ধর্মাবলম্বীদের কাছে নিজেস্বতা হাড়ায়। যাইহোক আমরা  ছেঁড়া দ্বীপের প্রধান অংশে পৌছালাম। অনিন্দ্য সুন্দর গাছ গাছালি দিয়ে ভরা এই দীপ। নানা রকম গাছ বিশেষ করে কেয়া গাছে ভরপুর এক কেয়াবন।

ছবি : কেয়া গাছ

আমরা সেখানে একটা ডাবের দোকান দেখলাম, দানব আকৃতির সব ডাব দেখে এগিয়ে গেলাম।দোকান মালিক মধ্য বয়স্ক এক দম্পতি ছিল।তারা আমাদের জানালেন তারাই একমাত্র পরিবার এই ছেঁড়া দ্বীপে বসবাস করে। ছেঁড়া দ্বীপে বসবাস নিষিদ্ধ জানতাম।হয়তো এই পর্যটন মৌসুমে তারা অবস্থান করে। তবে সেন্টমার্টিনে স্থানীয় লোকবসতি আছে প্রায় ৯ হাজারের অধিক।তবে ইতিহাস বলে ২০০ বছর আগে ১৩ টি পরিবারই প্রথমে সেন্টমার্টিন দ্বীপে বসতি গড়ে তোলে।যাইহোক ছেঁড়া দ্বীপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে স্বচ্ছ পানি ও নানা প্রজাতির প্রবাল। ইচ্ছা করে স্বচ্ছ পানি স্পর্শ করতে। পানিতে নেমে হুড়াহুড়ি আর দাপাদাপিতে কখন যে হাত-পা কিংবা শরীরের কোথাও কেটে যায়, টের পাওয়া যায় না। এত আনন্দের মাঝে এসব কাটা ছেঁড়ার অল্প ব্যথা তুচ্ছ বলে মনে হয়। আমরা স্বচ্ছ এই পানিতে কিছু ছোট মাছ ও ধরেছিলাম যদিও এগুলা আমরা সাগরে ছেড়ে দিয়েছিলাম।কেয়াবন আর প্রবালের সংস্পর্শ শেষে আমরা ফিরলাম সেন্টমার্টিনে।কারন সময় এর সল্পতা। যারা দিনে গিয়ে দিনেই সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে আসবেন তারা পরবর্তীতে আফসোস করতে পারেন তাই সবচেয়ে ভালো হয় অন্তত একদিন সেন্টমার্টিনে অবস্থান করা। এতে যেমন পুরো দ্বীপ ঘুরে দেখতে পারবেন তেমনি এই আনন্দময় ভ্রমণ আপনাকে সবসময় মোহিত করবে।সেই বিবেচনায় আমরা এক রাত অবস্থানের ট্যুর প্যাকেজ নিয়েছিলাম।

ছবি : ছেঁড়া দ্বীপের এক অংশ।

আমরা ফিরে সেন্টমার্টিন এর উত্তর পূর্ব সৈকতে গেলাম।সেখানে অনেক গুলা দোকান ছিল।এক কথায় সামদ্রিক মার্কেট ।বিভিন্ন ধরনের জিনিস পত্র পাওয়া যায়। আমরা স্মৃতি সরুপ কিছু কেনাকাটা করলাম।আর অপেক্ষা করতে লাগলাম সূর্য অস্তের।এর মাঝে অনেক ফটোগ্রাফি করে ফেল্লাম একজন একটা স্টাইল করলে সেটা সবাই করতাম।আমাদের মাঝে আমি সবচেয়ে বেশি ফটোগ্রাফি পছন্দ করতাম।এতো ফটো উঠাতাম যে মেমোরির স্টোরেজ বারংবার ফুল হয়ে যেত।আমি আর কোদু ফটোগ্রাফি স্টাইল যেটা করতাম পরে সেই একই স্থানে একই পজিশনে বাকিরাও সেই স্টাইলে ছবি উঠাতো।কারন এটা আমাদের ট্যুরের একটা উল্লেখযোগ্য আনন্দের বিষয় ছিল।যাই হোক সূর্যাস্তের সময় হয়ে গেল আমরা উপভোগ করতে লাগলাম আর ফটোসেশান করতে থাকলাম।সেন্টমার্টিন যাবেন আর সূর্য নিয়ে ছবি উঠাবেন না তা কখনো হয়?

ছবি : সূর্যাস্তেয় কানাবাবা।

আমরা সন্ধার পর হোটেলে ফিরলাম।যা কেনাকাটা করেছিলাম সে সব হোটেলে রেখে ফ্রেশ হয়ে আবার বাহির হলাম বারবিকিউ পার্টি করতে। কেউ সেন্টমার্টিন গেল আর সে বারবিকিউ উপভোগ করলো না তা হলে তার ট্যুর এর অর্ধেক আনন্দই বাকি রয়ে যাবে। আমরা যথারীতি পছন্দসই মাছ কিনে বারবিকিউ করলাম। খুব চমৎকার এক পরিবেশ,সৈকতে বসে সমুদ্র উপভোগ আর সাথে খাওয়া দাওয়া গল্প আড্ডা শহুরে জীবন কে যেন নিমিষেই ভুলিয়ে দেয়। আমরা বারবিকিউ পার্টি শেষে বীচ চেয়ারে শুয়ে সমুদ্রের গর্জন আর হিমেল হাওয়ায় হাড়িয়ে গিয়েছিলাম।রাত ৯ টা নাগাদ জোয়ারে ভরো গেল চারপাশ।তখন আমরা সৈকত ছেড়ে বাজারে চলে আসলাম। সেই সময় বীচ চেয়ার গুলা ঘন্টায় ২০ টাকা করে ভাড়া ছিল।সমুদ্র বিলাসের অন্যতম বৈশিষ্ট্য এই চেয়ার গুলো। প্রপটপ পজিশন এর এর চেয়ার গুলা যেন চেয়ার নয় একটা বেড,সাথে আছে বাহারি রং এর ছাতা। রাতে বাজার ঘুরে আমরা রেস্তোরাঁয় ফিরে খাবার পর্ব সেরে নিলাম।তারপর পোশাক পরিবর্তন করে জেটি ঘাটে আড্ডা দিলাম হিমেল হাওয়ায় আমরা হিমায়িত হয়ে যাচ্ছিলাম।তাই তাড়াতাড়ি আড্ডা শেষ করলাম এবং হোটেলে ফিরে গেলাম।আমরা জানতাম না রাতে বিদ্যুৎ এর ব্যাবস্থা থাকে না।আমরা সারাদিন ফটোগ্রাফি করায় আমাদের মোবাইল এবং ক্যামেরার চার্জ শেষ হয়ে গিয়ে ছিল।ভেবেছিলাম রাতে চার্জে দিয়ে ঘুমাবো কিন্তু সে গুড়ে বালি। এসে দেখি জেনারেটর বন্ধ করে দিয়েছে।জানতে পারলাম আবার সকালে চালু হবে।কি আর কিরার হতাশ হয়ে শুয়ে পরলাম।সারাদিন কোনো ক্লান্তি গ্রাস না করলেও বিছানায় শোবার পর খুব ক্লান্তি অনুভব করলাম। দুই বেডে পঞ্চপাণ্ডব গল্প করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে গিয়েছিলাম সেটা ঠিক মনে নেই।এলার্মের শব্দে আমাদের ঘুম ভাংলো।তারাহুরো করে উঠে পূর্ব সৈকতের দিকে দৌড়ালাম। সূর্য তখনও উঠে নি,আমরা অপেক্ষা করতে লাগলাম নন্তু সূর্যের। দিগন্ত লাল হয়ে সূর্য উঠলো।আল্লাহর অশেষ রহমতে আমাদের নতুন দিন শুরু হলো।আমরা যথারীতি সকালের নাস্তার পর্ব সেরে হোটেল থেকে বাই সাইকেল ভাড়া নিলাম।সেই সময় সাইকেল ঘন্টায় ৩০ টাকা ছিল। আমরা সাইকেল নিয়ে দক্ষিণ সৈকত ধরে আবার ছেঁড়া দ্বীপে গেলাম।আগেই বলেছিলাম ভাটা থাকলে এই দ্বীপে হেটে বা সাইকেলে যাওয়া যায়।প্রায় ৪ ঘন্টা সাইকেল জার্নিতে আমরা পুরো সেন্টমার্টিন প্রদক্ষিণ করেছিলাম।শহরে সাইকেল চালাতে বিরক্ত লাগলেও এই দ্বীপে আপনার আনন্দ লাগবে এটা নিশ্চিত বলা যায়।সৈকতের বালি আর মাঝে মাঝে সমুদ্রের হালকা পানিতে সাইকেল চালানোর অনুভূতি অন্যরকম।

ছবি : সৈকত থেকে।

আমরা সাইকেল জমা দিয়ে আবার সমুদ্র স্নানে গেলাম।এর মাঝে সৈকতে আমাদের জাতীয় খেলা হা ডু ডু খেল্লাম,যার রেফারি আমি ছিলাম।খেলা শেষে সৈকতের বালিতে নিজেদের নাম আঁকা আঁকি করতে লাগলাম।কানাবাবা খেলায় লাফালাফি বেশি করায় ক্লান্ত হয়ে বীচে শুয়ে ছিল।আমরা সুযোগ বুঝে ওকে বালি দিয়ে ঢেকে এক প্রকার জল পাঠা বানিয়ে দিলাম। সমুদ্রে জল পরীর দেখা না মিল্লেও জল পাঠা দেখার ভীড় লেগেছিল, হা হা হা।সময়ের সল্পতায় আমরা তাড়াতাড়ি সে যাত্রায় সেন্টমার্টিন এর গোসল শেষ করলাম।কারন দুপুর ৩ টায় আমাদের সীপ চলে আসবে এবং ফিরে যেতে হবে কক্সবাজার। 
সাগরের গর্জন, নীলাভ পানি, পূর্ণিমা রাত, দানম আকৃতির ডাব,সৈকত, প্রবাল-শৈবাল, কেয়া বন, হিমেল হাওয়া, সাগরলতার মায়াময় স্নিগ্ধতা,দীর্ঘসময় জাহাজে ভ্রমণ মিলে আমাদের কক্সবাজার এর ট্যুর তথা দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন ট্যুর মনে দাগ কেটে রয়ে গিয়েছে।



বল্টু
লিভারপুল,ইংল্যান্ড 
১২-০১-২০২৫




মন্তব্যসমূহ

  1. কয়েকবছর আগে একবার সেন্টমার্টিন গিয়েছিলাম।আল্লাহর এক অসাধারণ প্রাকৃতিক নিদর্শন। এই দ্বীপে না গেলে তা ব্যাক্ত করা কঠিন।তবে এই গল্পের মধ্যে সেন্টমার্টিন এর সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে।
    পরের গল্পের জন্য অপেক্ষায় রইলাম।

    উত্তরমুছুন

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন