দেশের বাহিরে স্যাটেল হওয়ার আগ্রহ আমার আগেও ছিলনা এখনো নেই। এই চরম সত্য কেউ কখনো বিশ্বাস করে নি। আমার ইংল্যান্ডে আসার মূল উদ্দেশ্যই হলো ডক্টরেট করা। ছোটো বেলায় অনেকের কাছেই শুনেছি আবার বইতেও পড়েছি "বিলাত হতে ডক্টরেট" করে দেশে এসেছে। এই কথা আমার মস্তিষ্কে একটা ক্ষুধা তৈরী করে ফেলেছে। সেই থেকে আমি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন বলতে বিলাত তথা ইংল্যান্ডকেই বুঝি।
আমার জন্মভূমি বাংলাদেশ ছাড়া দ্বিতীয় কোন দেশকে নিয়ে যদি আমি ভেবে থাকি সেটি ছিল এই ইংল্যান্ড। কিন্তু এখন আর আমি ইংল্যান্ড নিয়ে ভাবতে পারি না। যদিও এখানে আমি আমার আত্নীয়-স্বজন ও কাছের বন্ধুদের ছাড়া বাকি প্রায় সবই পেয়েছি। এই যেমন আমার শখ, আমার স্বপ্ন, আমি যেমন পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাস্তা-ঘাট চাই, যেমন ঝামেলা মুক্ত সিস্টেম চাই,সে সবই পেয়েছি। এখানে থাকলে আমি খুব অল্প সময়েই বেশ টাকা-পয়সার মালিক হবো ,ভবিষ্যতে সুন্দর ক্যারিয়ার হবে সবই সত্য।কিন্তু দেশে কাটিয়ে আসা প্রতিটি অভ্যাস আমাকে মারাত্মক ভাবে আহত করছে। পরিবারের আর আত্মীয়-স্বজনের সান্নিধ্য, বন্ধু-বান্ধবীদের ভালবাসা তার মধ্যে অন্যতম।
দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে চাওয়া এই আমি এখানে এসে এক ধরনের যান্ত্রিক জীবন পার করছি। এরকম যান্ত্রিক জীবন তো আমি কখনোই চাইনি। আসলে আমার মতো মানুষের জন্য বিদেশ নয়। এই বিদেশ কিছুদিনের জন্য ঘুরে বেড়ানোর জন্য হলে ঠিক আছে,স্থায়ী স্যাটেল হওয়ার জন্য নয়। এখানের বাতাস এতো বিশুদ্ধ, এতো নির্মল কিন্তু তাতেও আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। পড়াশোনা শেষ করে কবে দেশে যাবো সেই অপেক্ষায় আছি। এখন প্রতিটা দিন কাউন্ট করি কবে একটু দেশে যেতে পারবো, কবে পরিবার আত্নীয় স্বজনদের সান্নিধ্য পাবো,কবে বন্ধুদের নিয়ে প্রাণ খুলে আড্ডা দিতে পারবো,কবে আমার প্রিয় গ্রাম আর প্রিয় ভ্রমণস্থান সেন্টমার্টিনে যেতে পারবো।
হয়ত বলতে পারেন বন্ধু-বন্ধব তো ইউনিভার্সিটি অথবা কর্মক্ষেত্র থেকে নতুন করে তৈরী হয়।আর আত্নীয়-স্বজনদের অভাব প্রবাসী কমিউনিটি হতে কিছুটা হলেও পূরণ হতে পারে। তবে বলি, একটা সময় ভাবতাম যারা উন্নত দেশ গুলাতে আসে তারা সবাই উন্নত পরিবার থেকেই আসে।তাদের মন অমানুষিকতা উন্নত থাকে,কিন্তু সেটি ইংল্যান্ডে এসে ভুল প্রমাণিত হয়ে গেছে। মূলত ইংল্যান্ডে কেউ পড়তেই আসে না, সবাই আসে পাউন্ড কামাতে আর এখনে স্যাটেল হতে। তাই নিজের উন্নত মন-মানসিকতা যদি পূর্বে কারো থেকেও থাকে সেটা আর এখানে প্রকাশ পায় না। এখানে দক্ষিণ এশিয়ান বাঙ্গালীদের শুধু যান্ত্রিক জীবন সেই সাথে চামারপনা প্রকাশিত হতে দেখা যায়।
যদিও এটা উল্লেখ করা উচিত নয় তবুও বলছি,এখনে এসে বেশিরভাগ বাঙ্গালীদের এমন একটা ভাব তৈরি হয় যে তারা মূলত বাঙ্গালী না,তারা জন্মসূত্রে ইংলিশ। যদিও আমি এখন অব্দি যত দেশীও মানুষের সাথে পরিচিত হয়েছি তাদের প্রায় শত ভাগ ই আমাকে বলেছে মূল লক্ষ স্যাটেল হওয়া আর সেটা যে ভাবেই হোক,এ্যাসাইলাম হলেও ক্ষতি নেই। এরা সিংহভাগ ই আবার দেশ থেকে লোন করে এসেছে এখানে। তাই হয়তো চিন্তায় নিজেদের পরিচয়ও তারা ভূলে গিয়েছে। এদের ভাবের কথা এজন্যই উল্লেখ করলাম, রুপক অর্থে অনেকে আছে দেশে ১০০০ টাকার নোট ছুঁয়ে দেখে নি,কিন্তু এখানে ম্যাথরি করে কিছু পাউন্ড উপার্জনের দরুন এমন ভাব নিয়ে ইংলিশ সেজে চলে যে মুই কি হনুরে। তারা আবার বাঙ্গালীদের থেকে দূরে থাকতে চায়, বাঙ্গালী দেখলে নাক শিটকায়।
এখানে আরো একটা বাঙ্গালী জাতি আছে,যারা নিজেদের সিলোটি বলেই পরিচয় করিয়ে দেয়,এবং এরা সিলেট বিভাগের যে জেলায় বাড়ি হোক না কেন তারা সিলেট ই বলবে। আর সিলেট জেলার বাহিরে অন্য কোন জেলা হলে সেটাকে তারা ঢাকা বলে গন্য করবে। এরা আবার কথায় কথায় অন্যদের "এ্যাজ এ নন সিলোটি" বলে সম্মোধন করে,এজন্যই আরো একটা জাতি বললাম। আর যুক্তরাজ্যের যে শহরেই বাস করুক না কেন তারা সেটাকে লন্ডন বলে দাবি করে। সব সময় একসাথে বসবাস করি এমন সবাই ঠিকঠাক ভালো ব্যাবহার করে,তবে মাঝেমধ্যে নতুন কোনো সিলোটি মহাদয়ের সাথে পরিচয় হলে তারা নন সিলোটিদের আলাদা হিসাবেই দেখে,এটা লক্ষ করা যায়। এটাই আমাদের এখানে সামাজিক অবস্থা।
সবচেয়ে বড় কথা হলো আপন আর পরের যে ব্যাপার। নিজের দেশ বলতে আলাদা একটা শান্তি আছে যেটা অন্যের দেশে পাওয়া যায় না। সব দেশেই কম বেশি বর্ণবাদ ব্যাপারটা আছেই। এখানেও সেটা লক্ষনীয়। বিশেষ করে পর্দা করা নিয়ে আমার সহধর্মিণীকে প্রায়শই হেয় হতে হয়। পর্দা সহকারে কাজ তো নিজ দেশেও পাওয়া দুষ্কর কিন্তু রাস্তায় চলাফেরার সময় পর্দা দেখে অনেক বাজে ইংগিতের শিকার হতে হয়।
বল্টু
১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫
লিভারপুল, ইংল্যান্ড।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন